সপ্তদশ অধ্যায় বিচ্ছেদ
পরিষদের পরিবেশ হঠাৎই অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। দিঝু তখনো বুঝতে পারেনি কেন এমন হল, অথচ দলের মূল শক্তি থেকে ইতিমধ্যে তিনজন চলে গেছে। যারা আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, তারাও আচমকা জেগে উঠে দলের মধ্যে জানতে চাইল কী ঘটেছে।
এ সময় কিছু বলার প্রয়োজন ছিল না। খানিক পর সেনাপতির মতো গম্ভীর স্বরে মিলিটারি ছুরির অধিপতি বলল, ‘‘এই কয়েকজন, আগেভাগে চলে যাওয়াই বোধহয় ভালো হয়েছে!’’ কিন্তু নিজের যুক্তির জোর অপ্রতুল মনে হওয়ায় আবার বলল, ‘‘মানুষের তো নিজস্ব ইচ্ছা আছে, জোর করে দলে রাখলে পেছন থেকে গণ্ডগোল করবে না, তার নিশ্চয়তা নেই। বরং আগেভাগে চলে গেলে আমরাও প্রস্তুতি নিতে পারি।’’
ওই কথাগুলো দলেই বলা হয়েছিল, কিন্তু খুব দ্রুতই সবার আলোচনায় হারিয়ে গেল। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল, মূল শক্তির কয়েকজন কেন দল ছাড়ল, কেউ কেউ ইতিমধ্যে সন্দেহজনক ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছে।
দিঝু চেয়েছিল নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে, যাতে শত্রুপক্ষের অনুসন্ধানকারীদের মোকাবিলায় দলের সমন্বিত শক্তিতে এগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো। তবে তার মনোবল দৃঢ় ছিল বলে ছোটখাটো এই ধাক্কায় সে ভেঙে পড়েনি। দলে নতুন করে তিনজন নিয়ে আবার মূল দল সাজিয়ে ফেলল। মূল দল গড়ে উঠলে, অন্য অনুসন্ধানকারীরা সন্দেহ পোষণ করলেও, তাদের ছন্দেই চলতে বাধ্য।
এদিকে দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া চাও গাও এসব খবর জানে না। অনুমান করতে পারলেও সে আর এতে মাথা ঘামায় না। তার পরিকল্পনা সবসময় ছোট গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে, এটা তার পেশাগত অভ্যাস, বদলানো কঠিন। তখন সে ক্যাম্পের ফটকে দাঁড়িয়ে, লাও বা’কে বের হওয়ার অপেক্ষা করছিল এবং মনে মনে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ভাবছিল।
কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যিই লাও বা’ ফটকে এসে হাজির হল। সে মুখ খুলতে না খুলতেই চাও গাও জিজ্ঞেস করল, ‘‘তুমি কি দল ছেড়েছ? তোমার কৃতিত্ব পয়েন্ট খরচ করেছ তো?’’
লাও বা’ থমকে গেল, মাথাভর্তি প্রশ্ন মুহূর্তে গিলে ফেলল, অবচেতনে বলল, ‘‘আরও অর্ধেক আছে!’’ বলার পর বুঝতে পারল কী ভুল হয়েছে। চাও গাও-এর মুখেও অনুতাপের ছাপ।
সে জানত এই প্রশ্নে লাও বা’ কতটা চমকে যাবে, কিন্তু তাকে আগে কৃতিত্ব পয়েন্ট খরচ করতে বলা উচিত ছিল। লাও বা’র মানসিক অবস্থায় সে কোনোভাবেই এসব খেয়াল রাখত না। লাও বা’র ছিল চৌদ্দশ কৃতিত্ব, অর্ধেক মানে সাতশ’র বেশি—এটা দুইটা উৎকৃষ্ট নীল বর্ম কেনার সমান! শুধুমাত্র নাটকীয়তার জন্য এত কৃতিত্ব অপচয়, সত্যিই আফসোসজনক।
চাও গাও যখন নিজের জন্য অনুতপ্ত, লাও বা’র অনুতাপ মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হল। তারপর আবার চাও গাও এর কথায় মন দিল, তার হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করতে লাগল, ‘‘ছায়াতল কীভাবে এতটা আহত হল? তুমি কি সত্যিই তাকে মেরে ফেলতে পারবে?’’
চাও গাও এই প্রথম কোনো পুরুষের হাতে ধরা পড়ল, আবার তার শক্তির কাছে নিজেকে অসহায় বোধ করল, কয়েকবার ছাড়ানোর চেষ্টা করেও না পেরে হাল ছেড়ে সংক্ষেপে আগের দুনিয়ার ঘটনা বলল।
লাও বা’ একটু ভেবে দেখল, চাও গাও আর ছায়াতলের শত্রুতা সে নিজে দেখেছে। ছায়াতলের স্বভাব অনুযায়ী সে চাও গাও কে বদলা নিতেই আসবে, চাও গাও এর মিথ্যা বলার কোনো কারণ নেই, তাই সে যা বলেছে, সত্যি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এটা ভেবে সে নতুন করে উদ্দীপ্ত হল। তার এখনকার সবচেয়ে বড় বিশ্বাস প্রতিশোধ, আগে আশা ছিল না বলে হতাশ ছিল, এখন হঠাৎ সম্ভাবনা দেখে চরম উত্তেজিত হয়ে পড়ল। চাও গাও এর হাত আরও জোরে চেপে ধরল, এতে চাও গাও আরও বেশি বিরক্ত হল।
‘‘তোমার কাছে আমি এখন ঋণী। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে বললেই হবে!’’—লাও বা’ এবার খেয়াল করল এতক্ষণ চাও গাও এর হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল। অস্বস্তি ঢাকতে চাও গাও’র কাঁধে চাপড়ে, নিজের বুকেও চাপড়ে প্রতিশ্রুতি দিল।
চাও গাও ছোটখাটো নয়, প্রায় একাশি ইঞ্চি এবং যথেষ্ট শক্তিশালী, কিন্তু লাও বা’র পাশে এক মাথা ছোট লাগছিল। দুই মিটার লম্বা লাও বা’র কাঁধে চাপড় খেয়ে চাও গাও’র মনে খানিকটা অপমানের অনুভূতি হল।
সম্ভবত লাও বা’ নিজেও অস্বস্তি বোধ করল, নিজের ঢাল কাঁধে তুলে চলে যেতে উদ্যত হল। চাও গাও বিস্ময়ে তাকে আটকায়, ‘‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’’
‘‘ওপারের দুই শত্রু অনুসন্ধানকারীকে মেরে, তারপর ছায়াতলকে তাড়া করতে স্পেসে ফিরব।’’ লাও বা’ বলল এমন স্বাভাবিক কণ্ঠে, যেন বাজারে সস কিনতে কিংবা গোসল করতে যাচ্ছে।
চাও গাও অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল, অস্থায়ী দলবদ্ধতার আমন্ত্রণ পাঠাল। লাও বা’ থমকে কিছুক্ষণ ভেবে গ্রহণ করল। তার ধারণা, এটাই চাও গাও’র চাওয়া প্রতিদান—একজন ঢালধারী, একজন নিরাময়কারী, দুজনেরই আক্রমণের উপায় আছে। কাহিনির চরিত্র মেরে কৃতিত্ব বা পয়েন্ট জোগাড় করা কিংবা শত্রু অনুসন্ধানকারীদের মোকাবিলা—কোনটিতেই তারা পিছিয়ে পড়বে না। এভাবে চাও গাও’কে সাহায্য করেই তার ঋণ শোধ শেষ হবে।
‘‘স্পেসের মিশন যেহেতু এই ক্যাম্প পর্যন্তই, নিশ্চয়ই আরও পথ আছে...’’ অস্থায়ী দলে চাও গাও বিশ্লেষণ শুরু করল, কিন্তু লাও বা’ তখনই হাঁটা ধরল। বিব্রতকর ব্যাপার, চাও গাও চলল সম্পূর্ণ উল্টো পথে।
‘‘এদিকে!’’—দুজন একসঙ্গে বলল। লাও বা’ থেমে থাকায় চাও গাও বাধ্য হয়ে তার সঙ্গে চলতে লাগল। তারপর প্রশ্ন করল, ‘‘তুমি তুমু বাউয়ের বিপ্লব সম্পর্কে কতটা জানো?’’
লাও বা’ একটু ভেবে বলল, ‘‘মিং সেনা ভয়াবহভাবে পরাজিত হয়, ওরাত নেতা ইয়েশিয়েন ইংজুং সম্রাটকে বন্দি করে। আমরা যে শিবিরে, সেটাই পরাজিত গল্প।’’
চাও গাও আবার জিজ্ঞেস করল, ‘‘তাহলে স্পেস আমাদের এখানে পাঠিয়ে জরুরি প্রতিরোধ মিশনের উদ্দেশ্য কী?’’
লাও বা’ এই প্রশ্নে কিছুটা থমকে গেল। এই জরুরি প্রতিরোধ মিশনে কোনো মূল কাহিনি নেই, বাকি সূত্রও অস্পষ্ট, তাই সহজে উত্তর দেয়া গেল না।
চাও গাও শিক্ষক নন, কাউকে চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করার শখও নেই, সোজাসাপ্টা নিজের মত প্রকাশ করল, ‘‘আমার মতে, স্পেসের লক্ষ্য তিনটি—প্রথমত, দল পুনর্গঠন। স্পেস একাকী অভিযান উৎসাহিত করে না, কারণ ব্যক্তিগত শক্তি কখনোই দলের সমান নয়। এটা স্পেস যোদ্ধা তৈরির লক্ষ্যবিরুদ্ধ। দ্বিতীয়ত, আর্ক স্পেস ও অন্যান্য স্পেসের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে—শত্রু অনুসন্ধানকারী হত্যা করে সুবিধা নিতে হবে। এ কারণেই দুইটি রক্তিম চিহ্ন পেলেই ফেরা যায়। উপরি কথা, ঝলমলে সম্ভবত এই পথটাই বেছে নিয়েছে। তৃতীয়ত, সবচেয়ে অবহেলিত দিক—গল্প পাল্টালে বেশি সম্পাদন ও পুরস্কার মেলে। কাজেই এটাও স্পেস মিশন সম্পন্ন করার অন্যতম উপায়, বরং সবচেয়ে উৎসাহিত উপায়। তুমু বাউয়ের এই অবশ্যম্ভাবী পরাজয়ের গল্প, হয়তো অপরিহার্য নয়।’’
লাও বা’ হতভম্ব চোখে চাও গাও’র দিকে তাকাল। কাহিনি বিশ্লেষণ আয়রন আর্মি দলে বাধ্যতামূলক হলেও, সবই কাহিনির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ। স্পেসের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ এই প্রথম শুনল, কিন্তু মেনে নিতে বাধ্য, সত্যিই আকর্ষণীয় ও যৌক্তিক।
তবু লাও বা’ ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলল, সে বোকাসোকা নয়, শুধু একটু রুক্ষ স্বভাবের। ভেবেচিন্তে একে একে যুক্তি খণ্ডন করল, ‘‘শোন, কথায় কিছু যুক্তি আছে, কিন্তু সবই ফাঁকা কথা। প্রথমত, আমরা তো সদ্য দল ছেড়েছি, এই দুইজনকে দল বলবে? দ্বিতীয়ত, তুমি যে দিকে যাচ্ছ, ওটা তো মিং সেনার মূল ক্যাম্পে ফেরার পথ, ওখানে শত্রু অনুসন্ধানকারীর দেখা পাওয়া অসম্ভব। আর তৃতীয়ত, গল্প পাল্টানো—এটা তো কল্পকাহিনি। এখানে পাঁচ লাখ মিং সেনা, ইতিহাসে একশ’র কম বড় চরিত্র নেই, হাজারো উচ্চপর্যায়ের কাহিনি চরিত্র তো আছেই। তুমি তো কেবলমাত্র নবাগত, সামান্য ত্রিশ বৈশিষ্ট্য পেয়েছ, তুমি কি সত্যিই গল্প পাল্টাতে চাও?’’
চাও গাও তার যুক্তিপূর্ণ প্রতিবাদে রাগল না, বরং সন্তুষ্ট হয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘‘হ্যাঁ, আমি কাহিনি পাল্টাতে চাই!’’